বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সাপ্তাহিক পত্রিকার ভূমিকা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তৃণমূলের খবর, সমাজের অসংগতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশ্লেষণ এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা গভীরভাবে তুলে ধরতে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। দৈনিক পত্রিকাগুলো যেখানে প্রতিদিনের খবরের পেছনে দৌড়ায়, সেখানে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো খবরের পেছনের খবর এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে পত্রিকাগুলো এবং এর সাথে জড়িত সাংবাদিকরা তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বর্তমান সময়ের ডিজিটাল বিপ্লব, অসম প্রতিযোগিতা এবং নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার কারণে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
সংকটের মূলে কী? প্রথমত, আর্থিক অনিশ্চয়তা। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর আয়ের মূল উৎস বিজ্ঞাপন। কিন্তু সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে বৈষম্য এবং বেসরকারি বিজ্ঞাপনের অভাব পত্রিকাগুলোকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নীতিমালার জটিলতা। সরকার অনুমোদিত একটি মুদ্রিত পত্রিকার অনলাইন পোর্টাল, ই-পেপার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার জন্য নতুন করে নিবন্ধনের যে চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা। তৃতীয়ত, মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা। সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রাণ হলেন মফস্বল সাংবাদিকরা। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবীমা বা পেশাগত প্রণোদনার দারুণ অভাব রয়েছে।
সাংবাদিক ও পত্রিকার স্বার্থ রক্ষায় করণীয়: সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা মানেই তৃণমূলের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখা। পত্রিকা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবি:
১. বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা ও অগ্রাধিকার: সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে মফস্বল ও সাপ্তাহিক গণমাধ্যমকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
২. ডিজিটাল সম্প্রসারণে হয়রানি বন্ধ: প্রিন্ট পত্রিকার নিবন্ধনকেই তার ডিজিটাল মাধ্যম (অনলাইন, ই-পেপার, ইউটিউব ইত্যাদি) পরিচালনার জন্য বৈধ বলে স্বীকৃতি দিতে হবে। নতুন করে নিবন্ধনের নামে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৩. কল্যাণ ট্রাস্ট ও প্রণোদনা: সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় সাপ্তাহিক ও মফস্বল সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের জন্য উৎসব ভাতা, স্বাস্থ্যবীমা, পেনশন ও ঝুঁকি ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. আলাদা কল্যাণ বোর্ড গঠন: মফস্বল সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকদের কল্যাণে একটি পৃথক ‘কল্যাণ বোর্ড’ গঠন করা জরুরি, যা তাদের পেশাগত মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে।
৫. পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা যেন কোনোভাবেই স্থানীয় প্রভাবশালী বা প্রশাসনের হয়রানির শিকার না হন, তার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে সাপ্তাহিক পত্রিকা ও এর অকুতোভয় সাংবাদিকরা। ‘উইকলি এডিটরস ফোরাম‘ (WEF)-এর মতো সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে যৌক্তিক দাবিগুলো জানিয়ে আসছে, তা কেবল সাংবাদিকদের নিজেদের স্বার্থ নয়, বরং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থেই পূরণ হওয়া প্রয়োজন। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহলের আন্তরিক সদিচ্ছাই পারে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এক নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিতে।
সত্যের পথে এই কলম চলুক অবিরত, তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হোক আরও সুউচ্চ।
মুহা. শরীফ খান
মহাসচিব
উইকলি এডিটরস ফোরাম
ঢাকা, বাংলাদেশ।
28 আগস্ট, 2026
